ডাক্তারি একটা পেশার নাম। অন্য পেশাগুলোর মত জীবিকা নির্বাহের জন্য একটা পেশা। সাধারণত পেশাগুলোতে দুই ধরণের পণ্য বিক্রয় চলে।
প্রথমত, বস্তুগত। যেমন: চাল, ডাল, আটা, মোবাইল, কম্পিউটার (বর্তমানে কিছু অবস্তুগত তবে দৃশ্যমানও থাকে যেমন: সফটওয়্যার)।
দ্বিতীয়ত অবস্তুগত যেমন সেবাদানকারী পেশাগুলো। উকিল, শিক্ষক, ডাক্তার ইত্যাদি।
সুতরাং ডাক্তাররা সেবার বিনিময়ে টাকা উপার্জন করে যেমনিভাবে একটা ব্যবসায়ী তার পণ্যের বিনিময়ে। এখানে মহত্ত্বের কিছু নেই। পাঠাও রাইড দেওয়াও যে সেবা ডাক্তারিও সেবা। দুটোই আপনি ভালোভাবে দ্বায়িত্ব পালন করলে ভালো লোক। ক্ষতি করলে, খারাপ ব্যবহার করলে খারাপ।
পার্থক্য মোটেও নাই তা না। ডাক্তার মানুষের জীবন নিয়ে, কষ্ট-বেদনা নিয়ে কাজ করে। যা প্রত্যক্ষ দেখা যায়। যার পরিণাম খুব বেশি ও প্রায় সরাসরি বুঝা যায়। তাই তাদের দোষ ও গুণ দুইটাই মানুষের কাছে বেশি।
তাই ডাক্তারকে যেমন দ্বিতীয় ইশ্বর বলে তেমনি কসাই বলে। এখন মোটাদাগে যেটা বেশি হয় সেটা প্রচার বেশি হয়।
আদতে তারা কিছুই না। তবুও ওই যে প্রত্যক্ষ অবদান!! একজন শিক্ষক ফাঁকিবাজি করলে, উকিল ফাঁকিবাজি করলে মানুষ যত দ্রুত তার পরিণাম বুঝতে পারে বা তা যতটা ভয়াবহ পরিণাম হয় সাধারণত ডাক্তারদের ফাঁকিবাজিতে পরিণাম এর চেয়ে বেশি ভয়াবহ হয়। আবার আন্তরিকতার ক্ষেত্রেও একই কথা। শিক্ষকদের আন্তরিকতাও কাজে লাগে, ভালো একটা পরিণাম বয়ে আনে কিন্তু সেটা অল্প কয়েকদিনেই বুঝা যায় না বা জীবন-মরণের প্রশ্ন হয় উঠে না। তাই এটা নিয়ে বেশি হুল্লোড়।
ভাইয়া-আপু ২-৪ মিনিট সময় না, সময় কত সেটা আপনি হিসেব করুন। ১৬ বছরেই দোকান দিয়ে বসলে দিনে ১০-১২ ঘন্টা কাজ করেন। ব্যবসার কাছ থেকে ৩-৪ মাসেই টাকা পাওয়া বা ক্ষেত্র বিশেষ ৬-১২ মাস।
তারপর খরচ।
তেমনি একজন ডাক্তাররেও দিনে স্বাভাবিকভাবে ১২ ঘন্টার উপরে পড়ালেখা করতে হয়।
এভাবে ২৫-২৬ বছর পর্যন্ত কত সময় ও কত টাকা ইনভেস্ট তা হিসেব করেন। পরবর্তী সময়ে ২ মিনিটের সাথে ওই সময়গুলোও যুক্ত করবেন। পেশাভেদে টাকাটা ভিন্ন হয়। বেতন, উপার্জন ভিন্ন হয়। একজন খেলোয়াড় এক ম্যাচ খেলে লাখ টাকা কামায়। আবার একজন মজুর বছরেও পারে না।
এবং স্বাভাবিকভাবেই মানসিক পরিশ্রমের রিটার্ন বেশি। কারণ তার জন্য অনেক কৌশল, দক্ষতার দরকার হয়।
একজন মিস্ত্রি এর চেয়ে একজন সহকারী কাজ বেশি করে কিন্তু মিস্ত্রি এর বেতন বেশি।
তবে বাংলাদেশেই কিছু ডাক্তার দেখা যায় আপনাকে টেস্ট এর জন্য পাঠানে ৩০ মিনিট পর রিপোর্ট দেখার জন্য আলাদা ফি। এগুলো নিছক বাড়াবাড়ি।
এছাড়া যারা ভাবেন ডাক্তারি পাশের সার্টিফিকেট বের হওয়ার পরদিন থেকেই মাসে মাসে লাখ টাকা ইনকাম হয় তারা বোকার স্বর্গে আছেন। প্রতিষ্ঠিত হওয়ার জন্য, পরিচিত হওয়ার জন্য অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়। এবং প্রতিষ্ঠিত হলে আবার সে অনুযায়ী ফল পায়।
আরেকটা সমস্যা হচ্ছে, ডাক্তাররা নাকি টেস্ট দেয় শুধু এবং ডাক্তারতো টেস্ট দিবেই টেস্ট না দিয়ে কিভাবে রোগ ব্লবে এর বিতর্ক।
কথা সত্য। টেস্ট না করে কিভাবে রোগ ধরবে। আবার টেস্টের ভুল রিপোর্ট আসা সেটাও ডাক্তারের ধর্তব্য নয়। তা হচ্ছে মেশিন ও টেকনোলজিস্ট এর। এ জন্য ডাক্তারের দোষ দেওয়া কাজের কথা না।
কিন্তু বেশিরভাগ ডাক্তারই যেখানে টেস্ট করাটাই তাদের ব্যবসা ধরে নিচ্ছে সেটা খুব বড় সমস্যা। ব্যাক্তিগত অভিজ্ঞতাই বলি, আম্মুরে নিয়ে ঈদের দিন গ্যাস্ট্রিকের কারণে সরকারি হাসপাতাল যেতে বাধ্য হয়েছি। যাওয়ার সাথে সাথে রোগী দেখেই কিছু টেস্ট দিল এর মাঝে একটা করতে হবে বাইরে। যেটা উনার ওখানেই করা যায়। পরে যতজনে হাসপাতাল সংশ্লিষ্ট লোকের কাছে গিয়েছি শুনলাম সব রোগীকে বুকের এই টেস্ট উনি দিবেই সেটা যে রোগীই হোক না কেন।
আম্মুরে পরে অন্য হাসপাতালে ইমার্জেন্সি অন্য হাসপাতাল নেওয়ার পর ওরা বলতেছে এসব টেস্ট কেন এই রোগীর!!
চট্টগ্রামেই এক ডাক্তারের কাছে গেলাম উনি টেস্ট দিলেন। টেস্ট করা জায়গার ঠিকানা দিলেন। বললাম কত নিবে। উনি বলছে '৫০০ টাকা।'
আমি সেখানে না করে শেভরনে করলাম ১৬০ টাকা। ডাক্তাররে রিপোর্ট দেখাতে গিয়ে উনার ভ্রকুঞ্চন দেখে বুঝলাম কাজটা ঠিক করিনি।
এরকম প্রায় সবার সাথেই ঘটে। কারণ বাংলাদেশের প্রায় সব ডাক্তারই এই টেস্টের পার্সেন্টেজ নিয়ে থাকেন। এবং যার জন্য অপ্রয়োজনীয় টেস্টের সম্মুখীন হতে হয়।
সরকারী ডাক্তারদের প্রাইভেট রোগী দেখার বিষয়টা অনেকে মেনে নিতে পারেন না। ব্যাপারটা সত্যই দু:খজনক স্বাভাবিক বিবেচনা অনুযায়ী। কিন্তু আমাদের দেশ অনুযায়ী হাস্যকর। তার যে সময়টুকু সরকারি ডিউটি সেসময়টুকু সঠিকভাবে পালন করার পর বাকী সময় উনি যা খুশি করুক।
কিন্তু সমস্যা হচ্ছে ডিউটির সময়টুকু উনারা প্রাইভেট রোগী দেখেন। লক্ষ্মীপুর ৩-৪ বছর পূর্বে প্রাইভেটে ডাক্তার দেখাতে গেলাম। ডাক্তারকে ফোন দিল স্যার আসতে পারবেন কি না। উনার সম্মতিতে উনাকে সদর হাসপাতাল থেকে রিসিভ করে আনলাম। যিনি আনতে গেলো তিনি পূর্বপরিচিত হওয়ায় জানতে পারলাম স্যারের(ডাক্তারের) ইমার্জেন্সিতে ডিউটি থাকে। এখানে প্রাইভেট রোগী আসলে বাইক দিয়ে নিয়ে আসে।
আম্মুরে যখন নেই তখন আম্মুর অবস্থা বিকেল ৩ টায় খারাপ হলে নিচে গিয়ে দেখি ইমার্জেন্সী ডাক্তার নেই। স্যার বাইরে গেছে সন্ধ্যার পর আসবে(অথচ উনার ডিউটি চলে এবং উনি ছাড়া হাসপাতালে আর কোন ডাক্তার নেই)। ওখানের এক লোক একটা ওষুধ খাওয়াতে বললো। আমরা খাওয়ালাম। বিকেলে অবস্থা আরো খারাপ হওয়াতে আবার গেলাম। ওই লোক ঘাবড়ে গিয়ে বললো রোগী এখানে রাখা সম্ভব না। আমরা দ্রুত আম্মুকে নিয়ে গেলাম।
ডাক্তারদের সময় দেওয়া ও ব্যবহার।
সাধারণ মানুষের আরেকটা অভিযোগ ডাক্তার ২-৩ মিনিটের বেশি সময় দেয় না।
বাংলাদেশে সরকারি বলেন বা প্রাইভেট রোগীর লাইন দেখলে আমি মাঝে মাঝেই ভাবি এত রোগী শেষ করে কিভাবে এই সময়ে।
অনেকে বুদ্ধি দিবেন তাইলে কম রোগী দেখুক কিন্তু ভালো করে দেখুক। বুদ্ধিদাতা বাংলাদেশে থাকলে এই বুদ্ধি দিতো না। এত এত রোগী দেখার পরেও অনেকে সঠিক সময়ে ডাক্তার পায় না। আপনার ফোঁড়া, আপনাকেতো আর বলা যায় না এখন সিরিয়াল নাই ১০ দিন পর আসেন।
এই প্যারাটা লেখার কথা ছিল না। একজন ডাক্তারের (যার অনেক ফলোয়ার) পোস্টে দেখলাম তিনি বলেছেন ডাক্তারদের অনেকেই ফ্রী চিকিৎসা, ক্যাম্প দেওয়াতে বা পরিচিতরা টিপস চাইলে ফ্রী টিপস দেওয়াতে এই ডাক্তাররা মূল্য পায় না। ব্যাবসায়ীরা কি ফ্রীতে পণ্য দেয়?
আমি অবাক। শিক্ষকতা, উকিলরাও যে ফ্রীতে অনেকরে পড়ায়, মামলা দেখে তা উনার জানা নেই।
এবং ব্যবসায়ীরা যে ফ্রী পণ্য দেয় না কিন্তু ফ্রী সার্ভিস ঠিকই দেয়। তাদের ব্যবহার, ভালো মোড়ক দেওয়া এগুলো সার্ভিস নয়?
ডাক্তারদের ব্যবহার।
মোটাদাগে কয়েকজন ব্যাতিক্রম ছাড়া অনেক ডাক্তাররাই খারাপ ব্যবহার করে প্রশ্ন করলে বা দুই-একটা কথা বেশি জিজ্ঞেস করলে। সরকারিতে যারা ডিউটিরত থাকে তাদের মধ্যে এই হার বেশি।
হ্যাঁ, তারা সারাদিন এত রোগী সামলায়, এত কাজ করে মেজাজ ঠিক রাখা আসলেই কঠিন।
কিন্তু সে দায়তো মানুষের উপর বর্তাবে না। যে কারণেই আপনি মেজাজ খারাপ করেন আপনাকে মেজাজিই বলবে।
আপনি ১০০ জনকে দেখে বিরক্ত, ১০১ নাম্বার জনের কথা শুনে রাগ উঠাটা স্বাভাবিক কিন্তু ১০১ নাম্বার জন্য আপনার ঝাড়ি খাওয়ার প্রাপ্য না।
মেডিকেল রিপোর্ট সমস্যা, টেস্ট সমস্যা, হাসপাতালে বেড সমস্যা, ওষুধ নাই, ভালো যন্ত্র নাই, নার্সদের সমস্যা এই সব সমস্যার জন্য মানুষের একটা বিশাল অংশ ডাক্তারদের দায়ী করে।
এইটা সাধারণ মানুষদের ভুল, অন্যায়।
তারা কেন এমন করে? শুধু কি ডাক্তারদের সাথেই এমন করে?
মানুষ যার সাথে প্রত্যক্ষ জড়িত তাকেই বেশি দোষারপ করে। অন্যদের দোষ স্বীকার করে কিন্তু কথা শুনতে হয় যে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত থাকে তাকেই।
পড়ালেখার অবনতি আসলেই শিক্ষকদের শুনতে হয়। দাম বাড়লেই ব্যবসায়ীর দোষ।
একটা উদহারণ দেই: ধরেন একটা বোলার ৪ উইকেট নিয়ে বিপক্ষ দলকে ১৬০ রানে আউট করে দিল। দলের বাকী বোলাররাও ভালো করলো।
তারপর আপনার দলের ব্যাটসম্যানরাও খারাপ পারফর্ম করতে থাকলো। শেষে সমীকরন দাঁড়ালো ১ ওভারে ২ রান। ওই বোলারটি মাঠে। সে নিতে পারলো না।
ফলাফল ব্যাটসম্যানরা দোষারপ হবে কিন্তু বেশিরভাগ গালি ওই বোলারই শুনবে, তা নয় কি?
আমি এখানে সাধারণের মানুষের পক্ষে বলছি না, সবক্ষেত্রেই যে এমন হয় তার উদহারণ দিলাম মাত্র।
যাইহোক, প্রত্যেক পেশার মানুষই মহৎ কাজ করে মহৎ হতে পারে। আবার খারাপ কাজ করে খারাপ হতে পারে। কেউ এই পেশায় গেলেই আমরা তারে খারাপ বলবো না। আবার কোন একটা পেশাতে গিয়েই আমিতো মহৎকর্ম করে ফেলছি ভাবা চলবে না। আগে করতে হবে ভালো কিছু।
No comments:
Post a Comment